
রাজধানীর তেজতুরী বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা মো. আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বির হত্যার নির্দেশদাতা একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। তার সঙ্গে উঠে এসেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ফরিদুর রহমান খান ইরানের নাম। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাওরান বাজারের বিতাড়িত চাঁদাবাজ গ্রুপ। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
চাঞ্চল্যকর এই খুনের ঘটনায় এ পর্যন্ত গ্রেফতার হওয়া চারজনই (জিন্নাত, বিল্লাল, আব্দুল কাদির ও রিয়াজ) ভাড়াটে কিলার। বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কিলিংয়ের চুক্তি করে বিল্লাল। সে (বিল্লাল) অন্যদের পাশাপাশি তার দুই ভাইকেও এতে যুক্ত করে। এরা হলেন, কাদির ও রহিম। কাদির গ্রেফতার হলেও রহিম এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সূত্র জানায়, মুছাব্বির হত্যায় দুটি অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। একটি অস্ত্র দিয়ে জিন্নাত এবং অপরটি দিয়ে রহিম গুলি করে। তাকে কীভাবে হত্যা করা হবে সে বিষয়ে ৬ জানুয়ারি অর্থাৎ আগেরদিন ঘটনাস্থল রেকি করে যায় রিয়াজ। মূলত কাওরান বাজারের চাঁদাবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ ঘটনা ঘটেছে। আরও তথ্য পেতে গ্রেফতারদের রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই তারা মুখ খুলতে শুরু করেছে।
ঢাকার বাইরে থেকে গ্রেফতারের পর রোববার বেলা ১১টার দিকে চারজনকে আনা হয় ডিবি কার্যালয়ে। এর আগে শনিবার দিনে ও রাতে তাদের নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের জন্য বেশ কয়েকটি স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালায় ডিবির একাধিক দল। তবে এখানো অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ডিবি কার্যালয়ে আনার পর গ্রেফতাররা প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করায় সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এদিন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন হয়। ডিবি হেফাজতে রোববার রাতে তাদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেন গোয়েন্দারা। আজ তাদের আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে। রিমান্ডে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র।
ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, মুছাব্বির হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য কাজ করছে ডিবি। এছাড়া ঘটনায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রের উৎস অনুসন্ধান এবং সেগুলো উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি জানান, গ্রেফতার আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা ও পলাতকদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
৭ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর পশ্চিম তেজতুরীপাড়ায় হোটেল সুপার স্টারের পাশের গলিতে স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুছাব্বিরকে গুলি করা হয়।
এ ঘটনায় মুছাব্বিরসহ দুজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মুছাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করেন। অপর গুলিবিদ্ধ সুফিয়ান বেপারী মাসুদকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করছে ডিবি।
ডিবি জানায়, ঘটনার পরপরই জড়িতদের শনাক্তকরণ, গ্রেফতার ও হত্যার মোটিভ উদ্ঘাটনে কাজ শুরু করে পুলিশ। ডিবির কয়েকটি টিম ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে।
এর প্রেক্ষিতে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়। ডিবির একাধিক অভিযানিক দল শনিবার রাজধানী ঢাকা, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক অভিযান চালায়। অভিযানে দুই শুটারের একজন জিন্নাত, মূল সমন্বয়কারী বিল্লাল, ঘটনার পর আসামিদের আত্মগোপনে সহায়তাকারী আব্দুল কাদির ও ঘটনার আগের দিন ঘটনাস্থল রেকিকারী রিয়াজকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত নম্বর প্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল ও নগদ ছয় টাকা উদ্ধার করা হয়। হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি জড়িত অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে।
এদিকে মুছাব্বির হত্যায় প্রাথমিকভাবে যুবদলের সাবেক নেতা আব্দুর রহমানের সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছিল পুলিশ। তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। তবে জিজ্ঞাসাবাদে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দিয়েছে ডিবি।
এ বিষয়ে আব্দুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলেও এই হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নই। কারা এই হত্যায় জড়িত তাও আমি বলতে পারব না। ডিবি আমাকে অনেক বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আমি যেসব বিষয় জানি, সেসব বিষয় ডিবিকে অবগত করেছি। তিনি বলেন, মুছাব্বির জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ছিলেন। এর আগে এখানে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করেছেন। আমিও এলাকায় জনপ্রিয়। আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি।
আইএ/সকালবেলা